বৃহস্পতিবার ৮ অক্টোবর ২০২৬ - ১১:১৫
সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যবহারই ভার্চুয়াল জগতে মুমিনের জীবনযাপনের অপরিহার্য শর্ত

হাওজা নিউজ এজেন্সি— ভার্চুয়াল জগতে মুমিনের জীবনযাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো আধুনিক গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধাকে সচেতন, লক্ষ্যভিত্তিক ও নৈতিকভাবে ব্যবহার করা।

দ্রুত পরিবর্তনশীল বর্তমান যুগে মুমিনের জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ প্রযুক্তি থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বরং প্রযুক্তিনির্ভর জীবন ও আধুনিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বর্তমান সময়ের বাস্তবতারই অংশ।

এ ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো প্রযুক্তির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। একজন মুমিনকে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে— তিনি কী দেখবেন, কী প্রকাশ করবেন, কখন অনলাইনে থাকবেন এবং কখন মোবাইল ফোন বা অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিরতি নেবেন।

তাই ভার্চুয়াল জগতকে একদিকে যেমন ঈমানের শত্রু বলা যায় না, অন্যদিকে এটিকে জ্ঞান, সচেতনতা ও আত্মিক উন্নতির নিশ্চয়তাও বলা যায় না। এর প্রভাব অনেকাংশেই নির্ভর করে ব্যবহারকারীর পছন্দ, উদ্দেশ্য ও ব্যবহারের ধরনের ওপর।

উদাহরণস্বরূপ, একটি মোবাইল ফোন যেমন কাউকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিম্নমানের বা মূল্যবোধবিরোধী কনটেন্টে ব্যস্ত রাখতে পারে, তেমনি এটি পড়াশোনা, শিক্ষা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ, অন্যকে সহযোগিতা এবং ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমও হতে পারে। একইভাবে, যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপমানজনক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়তে পারে, সেটিই নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড প্রচারের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

ভার্চুয়াল জগত সুযোগ নাকি হুমকি— কীভাবে বুঝবেন?
সাংস্কৃতিক কর্মী ও হাওযার গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম হাবিব বাবায়ী বলেন, ভার্চুয়াল জগতে আমাদের উপস্থিতি মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো—সেখানে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর আমাদের মধ্যে কী বৃদ্ধি পাচ্ছে তা দেখা: সচেতনতা নাকি বিভ্রান্তি? প্রশান্তি নাকি উদ্বেগ? যোগাযোগ নাকি নিঃসঙ্গতা? নৈতিকতা নাকি আগ্রাসী আচরণ? কৃতজ্ঞতা নাকি আফসোস?

তিনি বলেন, ভার্চুয়াল জগত যদি জ্ঞান বৃদ্ধি, মানবিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করা, কল্যাণমূলক কাজ এবং আধ্যাত্মিকতার বিকাশের মাধ্যম হয়, তাহলে এটি বর্তমান জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। কিন্তু এটি যদি মানুষের সময়, চিন্তা ও আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে সেই সুযোগই গুরুতর চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

ভার্চুয়াল জগত বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন বাবায়ী বলেন, বর্তমানে ভার্চুয়াল জগত আর কোনো পার্শ্ববর্তী মাধ্যম নয়; বরং এটি দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। অনেক মানুষ ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন অনলাইন সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। কেনাকাটা, শিক্ষা, বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ, সংবাদ পড়া, বিনোদন, ব্যাংকিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কার্যক্রমের একটি অংশও এখন অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে।

তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল জগতকে বাস্তব জীবন থেকে আলাদা কোনো জগত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সেখানে মানুষের আচরণও তার জীবনযাপনের অংশ। মুমিনের জীবনযাপন যদি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, নৈতিক দায়িত্ববোধ, অন্যের অধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং আত্মিক উন্নতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তাহলে ভার্চুয়াল জগতেও এসব নীতি অনুসরণ করতে হবে।

জ্ঞান ও ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সাইয়্যেদা ফাতেমা সাইয়্যেদমোদাল্লালকার বলেন, বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেট ও ভার্চুয়াল জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন উৎসে দ্রুত ও ব্যাপক প্রবেশাধিকার।

তিনি বলেন, অতীতে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু বই, বক্তৃতা, শিক্ষামূলক ক্লাস ও বিশিষ্ট শিক্ষকদের কাছে পৌঁছানো সহজ ছিল না। বর্তমানে কয়েকটি সাধারণ অনুসন্ধানের মাধ্যমেই এসবের একটি বড় অংশ মানুষের নাগালে চলে এসেছে।

একজন আগ্রহী ব্যক্তি যেকোনো সময়ে কোরআন তিলাওয়াত শুনতে পারেন, আয়াতের অনুবাদ ও তাফসির পড়তে পারেন, ধর্মীয় বক্তৃতা দেখতে পারেন, শরয়ি বিধান ও আকিদা সম্পর্কে জানতে পারেন কিংবা অনলাইন শিক্ষাক্রমে অংশ নিতে পারেন। পাশাপাশি অনেক গ্রন্থাগার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের মূল্যবান গ্রন্থ ও গবেষণাকর্ম ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশ করছে।

তাঁর মতে, এই ব্যাপক প্রবেশাধিকার ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে এর জন্য ভার্চুয়াল জগতে সক্রিয়, সচেতন ও দায়িত্বশীল উপস্থিতি প্রয়োজন।

ধর্মীয় ও সামাজিক যোগাযোগের প্রসারে নতুন সম্ভাবনা
সাইয়্যেদা ফাতেমা আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চুয়াল জগত সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় যোগাযোগ গড়ে তোলা এবং তা সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে অনেক মানুষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি, দাতব্য কার্যক্রম ও সামাজিক উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে পারেন।

কোনো ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানের তথ্য প্রচার, অসহায় পরিবারের জন্য সহায়তা সংগ্রহ, মূল্যবান বইয়ের পরিচিতি তুলে ধরা, নৈতিক কোনো বক্তব্য প্রকাশ কিংবা কঠিন পরিস্থিতিতে থাকা বন্ধুকে আশাব্যঞ্জক একটি বার্তা পাঠানো—এসব ভার্চুয়াল জগতের ইতিবাচক ব্যবহারের উদাহরণ।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে কল্যাণমূলক কাজের জন্য সবসময় বড় বা সংগঠিত উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি উপকারী কনটেন্ট প্রকাশ, কোনো প্রশ্নের ভদ্র ও যুক্তিসংগত উত্তর দেওয়া, নির্ভরযোগ্য কোনো উৎসের পরিচয় তুলে ধরা কিংবা একটি ভুল সংবাদ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোও নৈতিক দায়িত্ব পালনের উদাহরণ হতে পারে।

ভালো কাজের আহ্বানের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ
হাওযায়ে ইলমিয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষিকা আরও বলেন, অতীতে সমাজের একটি বড় অংশের কাছে কোনো সাংস্কৃতিক বার্তা পৌঁছে দিতে ব্যাপক সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন হতো। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিটি ব্যবহারকারী নিজেই কনটেন্ট তৈরি ও প্রকাশ করতে পারেন। ফলে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের দিকে মানুষকে আহ্বান জানানোর ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।

অভিভাবকদের প্রতি সম্মান বিষয়ে একটি ছোট লেখা, অসহায়দের সহযোগিতা নিয়ে একটি ভিডিও, কোনো বইয়ের পরিচিতি, সৎকাজের প্রতি আহ্বান ও অসৎকাজ থেকে বিরত থাকার প্রচার, কোনো উপকারী দক্ষতার শিক্ষা কিংবা অনুপ্রেরণামূলক অভিজ্ঞতা—এসবের যেকোনো একটি কনটেন্টও বহু মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই ভার্চুয়াল জগতের আপাতদৃষ্টিতে ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ এসব সুযোগকে বিচক্ষণতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজে লাগানোও মুমিনের জীবনযাপনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

লিখেছেন— সাইয়্যেদ মোহাম্মদ মাহদী মুসাভী

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha